রেখা/সংখ্যারেখা/সরলরেখা/বক্ররেখা/বক্রতল
7pm – 10:14pm
02 May 2020 Saturday
------------------------------------
স্কুলের শিক্ষার্থীদের
গণিত শেখাতে গিয়ে কোনো বিষয়/তত্ত্বকে তাদের চোখের সামনে কিংবা কল্পরাজ্যে বাস্তবসম্মতভাবে
ফুটিয়ে তোলার জন্য কিছু কিছু ধারণা সৃষ্টি করার চেষ্টা করতাম। সেগুলোর মধ্য থেকে আজকে
দু’টি ধারণা নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো। ইনশাআল্লাহ!
১. সংখ্যারেখা/রেখা/সরলরেখা
------------------------------------------
বইয়ের সংগা থেকে
আমরা জানি, (আমার নিজের ভাষায় বলছি)
”কোন রেখার এক
একটি বিন্দুকে যদি এক একটি সংখ্যা দ্বারা চিহ্নিত করা হয় তবে তাকে বলে সংখ্যা রেখা।”
সংগাটা সহজ ও
বোধগম্য। ঠিক আছে। কিন্তু এখানে দু’টি বিষয় আছে, এক. বিন্দু, দুই. সংখ্যা।
তাই আমি বিষয়টাকে
আরো মূর্ত করার চেষ্টা করি।
প্রথমে রেখা/সরল
রেখার ধারণাকে মূর্ত করার চেষ্টা করি। রেখা/সরল রেখা আসলে কিভাবে সৃষ্টি হয়?
প্রথমে কলমের
মাথা দিয়ে ঘ্যাচাং করে খাতায় একটা বিন্দু আঁকি। তারপর তার গায়ে লাগিয়ে আরেকটা বিন্দু
আঁকি। সেটার গায়ে লাগিয়ে আরেকটা বিন্দু আঁকি। এভাবে অল্প কয়েকটি বিন্দু আঁকলেই দেখা
যায় সেটা একটা সরলরেখা/রেখা।
এখান থেকে আমরা
আসলে কী শিখলাম?
আমরা শিখলাম অসংখ্য
বিন্দু দিয়ে একটা সরল রেখা বা রেখা সৃষ্টি হয়।
যখনই একটা বিন্দুর
গা ঘেঁষে আরেকটা বিন্দু দিলাম তখনই মনে হলো বিন্দুগুলো যেন সামনে এগুচ্ছে। এভাবে এগুতে
এগুতে একটা সরল রেখার সৃষ্টি হচ্ছে। তার মানে অসংখ্য স্থির বিন্দু দিয়ে একটি (গতিশীল)
সরলরেখার সৃষ্টি হচ্ছে।
এবার আসা যাক
সংখ্যারেখার কাছে। এই বিন্দু দিয়ে গঠিত সরলরেখাটির কোন একটা বিন্দুকে ধরে ঘ্যাচাং করে
তার একটা নাম দিলাম 0(শূন্য)। তারপর গুণে গুণে দশ (যেকোন সংখ্যক হতে পারে) নম্বর বিন্দুর
নাম দিলাম ১। তারপরের ১০ নম্বর বিন্দুর নাম দিলাম ২….
এবার যদি আমরা
চাই 0 এর পরের বিন্দুটাকে একটা নাম দেব। দিয়ে দিলাম একটা নাম ০.১ (নাম দিতে তো আর পয়সা
লাগে না ;))। এর পরের বিন্দুর নাম দিলাম ০.২। এভাবে ০.৩, ০.৪….০.৯ এবং তারপর ১। এরকম
করে যখনই আমাদের শখ হবে তখনই কোনো একটা বিন্দুর নাম দিয়ে দিতে পারি। কেন পারবো না?
এটার নাম-ই তো সংখ্যা রেখা। আর রেখা তো বিন্দু দিয়েই সৃষ্টি।
এবার আরেকটা উদাহরণ
টেনে আনা যাক। ধরা যাক, সময়। সৃষ্টির সেই কোনো এক আদি থেকে শুরু করে এটা কোনো এক অন্তের
দিকে ছুটে চলেছে।এটা কিন্তু সরলরৈখিক গতিতে ছুটে চলেছে। মানে সরলরেখা বরাবর এগুচ্ছে।
হঠাৎ মাঝ পথ তাকে
ধরে ১ মিনিট সময় কেটে ফেললাম। মু হা হা হা। এই ১ মিনিট সময়কে আমরা একটা সরলরেখা কল্পনা
করতেই পারি, তাই না? কিন্তু কেন পারি? আচ্ছা, আপাতত ধরে নিলাম এটা একটা সরলরেখা। এটাকে
৬০টা সমান ভাগে ভাগ করলাম। ধরলাম, ৬০ভাগ হলো ৬০টা বিন্দু। আমরা জানি, ৬০ সেকেন্ডে এক
মিনিট। তাহলে ৬০ টা বিন্দুর প্রতিটাকে আমরা সেকেন্ড নাম দিতেই পারি। যেমনটা সংখ্যারেখায়
নাম দিয়েছিলাম সংখ্যা দিয়ে। এখানে নাম দিলাম সময় দিয়ে। ডিজিট ওঠে এমন ঘড়িতে আমরা যদি
এক মিনিট সময়কে দেখি তাহলে কী দেখতে পাই? প্রথমে ০ েসেকেন্ড, তারপর ০১, তারপর ০২, তারপর
০৩…০৯, ১০….৫৯ তারপর ১ মিনিট। সময় যে গতিশীল এটাতো আমরা মানি। একটা সেকেন্ডের বিন্দু
আরেকটা সেকেন্ডের বিন্দুর দিতে ধাবমান। যদি আপাত দৃষ্টিতে বিন্দুগুলো স্থির কিন্তু
সামগ্রীক ভাবে পুরো সময়টা গতিশীল। এজন্যই আমি গতিশীল সরলরেখা বলেছিলাম।
সময় নিয়ে আরেকটু
এগুনো যা’ক। আমরা তো টিভি, সিনেমা, ভিডিও দেখি। কিভাবে চলমান দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়?
আপনি আপনার মোবাইলের ভিডিও ক্যামরা দিয়ে ১ মিনিটের একটা রেকর্ড করবেন। কিছুই নয় ঐ এক
মিনিট ধরে ক্যামরার সামনে আপনার হাতটাকে উপর থেকে নিচের দিকে নেবেন। হাত নাড়লেন ভিডিও
করলেন। ভিডিওতে হাত নড়ার দৃশ্য দেখা গেল। কিন্তু কিভাবে এই দৃশ্যটা ক্যামরা ধারণ করলো?
এবার আসুন আবারও ১ মিনিটকে ৬০ ভাগে ভাগ করি। ক্যামরাটা করবে কি সময়ের প্রতিটি ভাগে
একটা একটা করে স্থির চিত্র ধারণ করবে।”তুমি কি কেবলি ছবি, শুধু পটে আঁকা” টাইপের চিত্র।নট
নড়নচড়ন। মানে ০১-তম সেকেন্ড অবস্থানে হাতের একটা স্থির চিত্র, তারপর ০২-তম সেকেন্ড
অবস্থানে আরেকটা চিত্র এভাবে ধরলাম ৬০টা স্থির চিত্র ধারণ করলো। এবার এই ৬০ টা চিত্র/ছবিকে
খুব দ্রুত চালনা করে হাতের পুরো এক মিনিট জুড়ে নড়নচড়ন ফুটিয়ে তোলা হয়। তার মানে সময়ের
অতি ক্ষুদ্র বিন্দুতে হাতের চিত্র স্থির। কিন্তু যখনই সেটাকে সময়ের সরল রেখা বরাবর
চালনা করা হয় তখনই সেটা চলমান। ছোট বেলায় বিটিভিতে দেখেছিলাম ঠিক েএভাবেই কার্টুন ছবি
বানানো হয়। যেমন জেরি দৌড়াচ্ছে। দৌড়ের প্রতিটি ভংগির আলাদা আলাদা ছবি আঁকা হত।তারপর
মেশিনে সেগুলিকে দ্রুত চালনা করে দৌড়ের দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হত।
তো যা’ই হোক এই
স্থির বিন্দু দিয়ে সরলরেখার ধারণা কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় আমার কাছে।
উচ্চা শিক্ষা
গ্রহণে, নতুন কিছু উদ্ভাবনে কিন্তু এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধারণা প্রয়োজন।
2. বক্রতল বা
বাঁকা তল:
------------------------------
আচ্ছা পৃথিবীটাতো
গোল। আমরা পৃথিবীর সেই গোলাকার শরীরের উপর আছি। কিন্তু আমরা কেন আমাদের চারপাশটাকে
সমতল দেখি?
কারণ আমরা বিশাল
গোলাকার পৃথিবীর অতি ক্ষুদ্র অংশকেই এক সংগে দেখে থাকি। যদি আমরা পৃথিবীর বিশাল একটা
অংশকে এক সংগে দেখতাম তাহলে পিঠ উঁচু তলের মতই দেখতাম। যেমন আমরা বিশাল সমুদ্রের পৃষ্ঠদেশ
এক সাথে দেখি।দূর হতে আসা কোনো নৌকার প্রথমে মাস্তুলের সম্মুখভাগ দেখা যায়। তারপর আস্তে
আস্তে পুরো নৌকাটাকে দেখতে পাই। কারণ পৃথিবীর উচুঁ পিঠের অপর পাশ থেকে নৌকাটা আসছে।
যেহেতু বিশাল একটা অংশ এক সাথে নজরে আসছে সেহেতু উঁচু পিঠের জন্য পুরো নৌকাটাকে একসাথে
দেখা যায় না। প্রথমে সামনের অংশ তারপর এর পরের অংশ এভাবে পুরো নৌকাটা। ছবি এঁকে দেখাতে
পারলে বোঝানো যেত।
মূল কথা হলো,
গোলাকার তলের যত ক্ষুদ্র অংশকে নেয়া হবে সেটা তত সমতল। তারমানে অসংখ্য ক্ষুদ্র সমতল
তথা সরলরেখা মিলে একটা বক্রতল সৃষ্টি হয়, তাই না? একটা বৃত্তের গা ঘেঁষে একটা সরলরেখা
আঁকুন। সরল রেখাটা যে বিন্দুতে বৃত্তকে স্পর্শ করেছে সেই বিন্দুর অতি ক্ষুদ্রতম অংশ
কিন্তু সমতল। সমতল না হলে তো সরলরেখাটা বৃত্তটাকে স্পর্শই করতে পারতো না।
এখন প্রশ্ন করতে
পারেন, জনাব, ধান ভানতে (বাচ্চা পড়াতে গিয়ে) শিবের গীত (গণিতের গীত) কেন গাই?
কারণ-১
অভিভাবক ও শিক্ষকদের
একটি চিরায়ত অভিযোগ হলো বাচ্চারা পড়াশোনায় মনোযোগী নয়, তারা পড়াশোনা করে না। প্রশ্ন
হলো কেন করে না? কারণ তারা যা পড়ছে, যা শিখছে তার সাথে তাদের চিন্তা ও কল্পনা-র কোন
ধরণের যোগসূত্র স্থাপন করতে পারছে না। ফলে অংককে নিছক অংকই মনে হয়। মনে হয় নীরস একটা
জিনিস। কি পড়ানো হচ্ছে, কেন পড়ানো হচ্ছে তারা কিছুই বুঝতে পারে না। প্রাণহীন জড় পদার্থ
যেখান থেকে কোনো রসের সঞ্চার হচ্ছে না। মজা না পেলে আমরা বড়রাও কোনো কাজ নিরবধি করতে
পারি না।
কারণ-২
আজকে যে বাচ্চাটা
ক্লাশ ওয়ানে পড়ছে সে কিন্তু সাড়া জীবন ক্লাশ ওয়ানেই পড়বে না। সে অনেক বড় জায়গায় পড়বে,
সে বিজ্ঞানী হবে, সে শিক্ষক হবে, সে প্রোগ্রামার হবে, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হবে। তার
মনে সহজভাবে তাকে পঠিত বিষয়বস্তুর সাথে সম্পর্কযুক্ত করে এমন কিছু ধারণা সঞ্চার করে
দিতে হবে যেন পরবর্তীতে বড় জায়গায় পঠিত বিষয়বস্তু সাথে নিজের চিন্তা, চেতনা ও কল্প
জগতকে সংযুক্ত (relate)করতে পারে। তবেই না সে বিজ্ঞানী, গবেষক, শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার
হতে পারবে।
যেমন ধরুন উপরের
সরলরেখা/সমতল, বক্ররেখা/বক্রতল বিষয়ে যদি তার স্বচ্ছ ধারণ তৈরি হয় তবেই সে বুঝতে পারবে
কেন বিজ্ঞানে অত্যন্ত ক্ষুদ্র স্থানকে পরম ধরে বৃহৎ স্থানের ধারণা নেয়া হয়। কেন
Differential Calculus এ ঢাল বের করতে অতি ক্ষুদ্রতম অংশকে নেয়া হয়? কারণ ঐ যে সেটাই।
বক্ররেখার অতি ক্ষুদ্রতম অংশ হলো সমতল। এজন্যই ক্ষুদ্রতম সমতলের হিসাবকে একক ধরে বিশাল
বক্ররেখার/বক্রতলের হিসাব পরিমাপ করা হয়। এটা সে তখনই বুঝতে পারবে যখন তার সরলরেখা/সমতল,
বক্ররেখা/বক্রতল বিষয়ে সম্মক ধারণা থাকবে, তার চিন্তা ও কল্প জগতে একটা প্রচ্ছন্ন ছবি
আঁকা থাকবে।
--
বি:দ্র: আমার
অতি ক্ষুদ্র জ্ঞান দিয়ে স্থুলভাবে বিষয়গুলোকে বাচ্চাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করতাম।
ভুল ত্রুটি ও চিন্তার সীমাবদ্ধ অবশ্যই আছে। নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝেও যদ্দুর সম্ভব আমার
সাধ্যমত চেষ্টা করতাম। গঠনমূলক আলোচনা, সমালোচনা আমন্ত্রিত।
Comments
Post a Comment