দৃষ্টিভঙ্গি-র মাত্রাবোধ
রচনাকাল: 4th July,
2017 – 11th February, 2018
---------
আমরা প্রায়:শই
বলি- এটা দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়।
আবার কখনওবা বলি
– অমুক ব্যক্তি তমুক ক্ষেত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছেন।
প্রশ্ন হলো, দৃষ্টিভঙ্গি
(দৃষ্টিকোণ) ও মাত্রা বলতে আসলে কী বোঝানো হয়েছে?
-
মানুষে মানুষে
ঝগড়া-ফ্যাসাদ, খুন-খারাবি, মারামারি, মত পার্থক্য এসবের পেছনে যে জিনিসগুলো প্রত্যক্ষভাবে
জড়িত তা হলো দৃষ্টিভঙ্গি ও মাত্রাবোধ। এত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়ে আমরা আসলে কতটা ওয়াকিবহাল?
-
একটা ফেইসবুক
পেইজে সুন্দর একটি ছন্দ পেলাম যেটা বিমূর্ত দৃষ্টিভঙ্গি-কে মূর্ত করার প্রয়াস পেয়েছে।
”তোরে বোঝাই রে
কোন মনে
তুইও সঠিক আমিও
সঠিক তফাৎ দৃষ্টিকোণে।”
-
এই দৃষ্টিকোণ
বা দৃষ্টিভঙ্গিকে যথাযথ দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা দেখতে পারি না বলেই ধর্মীয় কিছু বিষয় নিয়ে
আমরা নানা দল ও উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছি। অধিকন্তু, মানব জীবনের এমন কোনো দিক নেই যা
নিয়ে আমাদের পারস্পরিক বিভেদ নেই।
-
তো চলুন আমরা
চেষ্টা করি- দৃষ্টিভঙ্গিকে যথাযথ দৃষ্টিকোণে দেখার। তার সাথে সাথে আমাদের মাত্রাবোধকেও
যথাযথ মাত্রায় নিয়ে আসি।
-
দৃষ্টিকোণ ও মাত্রাবোধ
কে বোঝার জন্য আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর কোনো ডিগ্রি নেয়ার কোনোই দরকার নেই। আপনার
যদি তৃতীয় (অথবা চতুর্থ) শ্রেণির গণিত বই সম্পর্কে ধারণা থাকে তবে আপনার সহজেই বিষয়টা
বোঝার কথা। কারণ তৃতীয় (অথবা চতুর্থ) শ্রেণির গণিত বইয়ের জ্যামিতি অধ্যায়ের প্রথম অধ্যায়ের
প্রথম উদাহরণ দিয়েই খুব সহজে একটা বাচ্চাকেও দৃষ্টিভঙ্গি বা দৃষ্টিকোণ ও মাত্রা বোঝানো
যায়। এমনকি আমরা পদার্থ বিজ্ঞানের বলবিদ্যা ও পদার্থের ধর্ম অধ্যায়ে যে মাত্রা সমীকরণ
পড়ি সেটার মাত্রা ও আমাদের আলোচ্য মা্ত্রা একই জিনিস। অন্তত মৌলিক ধারণা তো একই। আবার
ধরুন ভেক্টর রাশির যোগ কিংবা বীজগণিতের গুন-এ যে মাত্রা যোগ-বিয়োগ হয় তার সাথে ‘অমুক
ব্যক্তির তমুক ক্ষেত্রে মাত্রার যোগ করা’ একই জিনিস।
-
একটা রুলার বা
স্কেলকে সোজা খাড়া ভাবে রেখে কোনোকিছুর সাথে আটকে রাখুন। এবার আপনার একজন বন্ধুকে ডেকে
আনুন। প্রথমে আপনি রুলারটির ঠিক চিকন অংশ বরাবর দাঁড়ান। তারপর রুলারটির দিকে তাকান।
কি দেখতে পাচ্ছেন? আপনার অবস্থান থেকে আপনি স্রেফ খাড়া একটা চিকন রেখা দেখতে পাচ্ছেন।
তার মানে আপনি খাড়া দৈর্ঘে্য একটা রেখার মত চিকন বস্তুকে দেখতে পাচ্ছেন। আপনি রুলারটির
শুধুমাত্র একটি দিক (দৈর্ঘ্য) দেখতে পাচ্ছেন। ফলে আপনার কাছে রুলারটিকে মনে হচ্ছে চিকন
কোনো একটা বস্তু।
-
এবার আপনার বন্ধুটিকে
রুলারটির ঠিক চ্যাপটা দিক বরাবর দাঁড় করান। এখন কিন্তু আপনার বন্ধু তার অবস্থান থেকে
রুলারটিকে একটি রুলার হিসেবেই দেখতে পাচ্ছে। আপনার কাছে মনে হয়েছিল রুলারটি একটি চিকন
কোনো বস্তু। আর আপনার বন্ধুর কাছে মনে হচ্ছে এটি একটি চ্যাপটা বস্তু বা রুলার। একই
বস্তুকে কেন দুই জন দুই রকম দেখতে পেল?
-
লক্ষ্য করুন,
আপনার অবস্থান থেকে আপনি রুলারটির একটা দিক মানে দৈর্ঘ দেখেছেন। এই দৈর্ঘ্যে-ই হলো
রুলারের একটা মাত্রা। কিন্তু আপনার বন্ধু তার অবস্থান থেকে দেখেছেন রুলারের দু’টি দিক
মানে দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ। তার মানে আপনার বন্ধু দেখেছে রুলারের দু’টি মাত্রা। আপনারা
দুই জনে দুইটি ভিন্ন অবস্থান থেকে একই বস্তুকে দেখেছেন। আপনাদের অবস্থান হলো আপনাদের
দৃষ্টিভঙ্গি বা দৃষ্টিকোণ। অর্থাৎ আপনারা দু’টি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বা দৃষ্টিকোণ থেকে
একই বস্তুকে দেখেছেন। এর ফলে আপনাদের মাত্রা বোধের হেরফের হয়েছে। মাত্রা বোধের হের-ফেরের
কারণে একই বস্তুকে আপনারা দুই জনে দুই রকম দেখেছেন।
-
এই উদাহরণ যদি
কারো কাছে কঠিন মনে হয় তবে চলুন একটা সামাজিক সমস্যা দিয়ে বিষয়টাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা
করি।
-
ধর্ষণ একটা সামাজিক
সমস্যা। সমাজে কেন ধর্ষণ সংগঠিত হয়? ধর্ষন সংগঠিত হওয়ার নানা কারণ থাকতে পারে। সমাজে
কারো কারো মতে ধর্ষণের মূল কারণ পুরুষের কু-রুচিপূর্ণ মন মানসিকতা। পুরুষদের মন মানসিকতার
পরিবর্তন হলেই ধর্ষণ বন্ধ হয়ে যাবে। মহিলারা যেভাবেই চলাফেরা (রুচিপূর্ণ বা কুরুচিপূর্ণভাবে)
করুকনা কেন পুরুষদের রুচি ঠিক হলেই ধর্ষণ বন্ধ হয়ে যাবে। এটা হলো একদলের মত। আবার আরেক
দল মনে করে ধর্ষণের জন্য মহিলাদের কুরুচিপূর্ণ চলাফেরাই দায়ী। মহিলারা ঠিকঠাক চলাফেরা
করলেই ধর্ষণ বন্ধ হবে। অর্থাৎ একদল দিচ্ছে শুধুমাত্র পুরুষদের দোষ, আরেক দল দিচ্ছে শুধুমাত্র মহিলাদের দল। আবার আরেক দল মনে
করে ধর্মীয় অনুশাসন মানলেই (পুরুষ ও মহিলা উভয়ই) ধর্ষণ বন্ধ হয়ে যাবে।
-
ধর্ষণ যদি একটা
সামাজিক সমস্যা হয় তবে এটা ঘটার কারণগুলিকে এর মাত্রা ধরে নিতে পারি। এখন ধর্ষণ যতগুলো
কারণে সংগঠিত হয়ে থাকে তার সবগুলোকে একসাথে যে দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায় সেটাই হলো সঠিক
দৃষ্টিকোণ। উপরের তিনটি দল তিন রকম দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্ষণ কে দেখেছে। তারা প্রত্যেকে
ধর্ষণের এক বা একাধিক মাত্রা থেকে বিবেচনা করেছে। রুলারকে যেরূপ তার প্রত্যেকটা(দুইটা)
মাত্রা সহ দেখার পরই সেটাকে যথাযথভাবে চেনা সম্ভব হয়েছে। তেমনি ধর্ষণ বা সমাজের যেকোনো
সমস্যাকে তার প্রত্যেকটা মাত্রা সহ না দেখলে সেটাকে যথাযথ ভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়
না। ফলশ্রুতিতে সেই সমস্যার সমাধানও সঠিক ও ফলপ্রসু হয় না। কোন একটা সমস্যাকে তার কোন
একটা মাত্রা বাদ দিয়ে দেখলে সেটার আংশিক ও বিকৃত রূপই দেখা হয় যেমনটা আপনি দেখেছেন
রুলারকে একটা চিকন বস্তু সদৃশ।
-
কিন্তু কেন আমাদের
দৃষ্টিভঙ্গির এত পার্থক্য? কেন আমরা যথাযথ দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে পারছি না? আমাদের আলোচ্য
প্রবন্ধটি শুধুমাত্র দৃষ্টিভঙ্গি ও মাত্রাবোধ কে মূর্ত করার উদ্দেশ্যেই লিখিত। এ প্রশ্নের
জবাব খোঁজা বাহুল্য হবে বিধায় এড়িয়ে যাচ্ছি। বস্তুত এই প্রশ্নের জবাব বোধ করি অনেক
জটিলও বটে। তবে আমার ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয়, আমাদের যথাযথ দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনে বস্তুকে/সমস্যাকে
না দেখার কারণ হলো মূলত স্বার্থের দ্বন্দ আর অযাচিত আবেগ। আমরা কোনো জিনিসকে স্বার্থের
উর্ধ্বে উঠে অযাচিত আবেগকে সংবরণ করে নিষ্কাম ও নির্মোহ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পারি
না। ফলে আমরা ঐ বস্তুর অনেক মাত্রা হয় আমাদের চোখে পড়ে না, না হয় চোখে পড়েও পড়ে না।
-
যা’হোক এবার আসবো
‘মা্ত্রা যোগ’ এর বিষয়ে। আমরা বলি – নজরুল গানের জগতে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন।
মাত্রা যোগ বলতে আসলে কি বোঝায়?
-
কাগজে A বিন্দু
থেকে B বিন্দু বরাবর একটা সরলরেখা আঁকুন। এবার এই রেখা বরাবর স্কেল রেখে B বিন্দু থেকে
সরল রেখাটি বাড়িয়ে C বিন্দুতে নিয়ে যান। ঘটনা কি ঘটলো? এটাই ঘটলো যে, AB সরল রেখাটি
স্রেফ বৃদ্ধিপেয়ে AC রেখায় পরিণত হলো। অর্থাৎ AB যেমন একটা সরল রেখা ছিল ঠিক তেমনি
AC বা BC ও একটা সরল রেখা। নতুন কিছু সৃষ্টি হয়নি। স্রেফ AB সরল রেখাটি দৈর্ঘে্য বৃদ্ধি
পেয়েছে। এবার C বিন্দু থেকে হেলানো ভাবে উপরের দিকে CD রেখা টানুন। এবার কিন্তু একটা
নতুন দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে। এখন আর সেটা সরল রেখা নয়। এবার D বিন্দু থেকে নিচের দিকে
আগের মত বাঁকা করে আরেকটা রেখা টানুন। এভাবে বিভিন্ন পথে রেখা টেনে আমরা একটা সুদৃশ্য
তারকা অংকন করতে পারি।
-
লক্ষ্য করুন,
যখন আমরা AB সরল রেখাকে একইদিকে একই ভাবে বৃদ্ধি করেছি তখন সেই একই সরলরেখা সৃষ্টি
হয়েছে। নতুন কিছুই সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু যখনই আমরা একটু অন্যদিকে অন্যভাবে রেখা টেনেছি
তখনই ঐ সরলরেখায় নতুন দিক/মাত্রা সৃষ্টি হয়েছে এবং এক সময় একটা সুদৃশ্য তারকার আকৃতি
সৃষ্টি হয়েছে।
-
তেমনি ভাবে, নজরুলের
আগে/পরে অনেকেই গান লিখেছেন, সুর করেছেন। এতে শুধুমাত্র গানের সংখ্যাই বৃদ্ধি পেয়েছে।
নতুন কোনো মাত্রা যোগ হয়নি। কিন্তু নজরুল বাংলা গানে যখন রাগের ঢংগে রাগাশ্রিত গান
বাংলায় সৃষ্টি করেছেন তখনিই বাংলা গানে নতুন মাত্রা যোগ হয় যা আগে কখনও কেউ করেনি বা
করতে পারেনি। এর ফলে গানের সংখ্যাই বাড়েনি, গানের অনেক নব দিগন্তও উন্মোচিত হয়।
-
একই কথা অন্য
সব ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য…. ইংরেজি গ্রামার এর বই, ওয়েব ডিভেলপম্যান্ট এর টিউটোরিয়াল ইত্যাদি
সব ক্ষেত্রেই বিষয়টা প্রযোজ্য। ধরুন কেউ অনেকগুলো বই ও নেট ঘেটে পড়াশোনা করে কিছু গ্রামারের
নিয়ম সংগ্রহ করে বই লিখলো বা টিউটোরিয়াল লিখলো। ওনার লেথায় তখনই ভিন্ন মাত্রা যোগ
হবে যখন তিনি তাঁর আহরিত জ্ঞানকে আত্মস্থ করে সেখান থেকে নির্যাস নিয়ে নিজের মত করে
বিশেষ পাঠক গোষ্ঠীর মেধা ও মনন কে মাথায় রেখে এমন কিছু লিখলেন যা গতানুগতিকতার বাইরে।
সেটা ব্যাক্তি ভেদে কম-বেশ সৃজনশীল হতে পারে। সেটা বিবেচ্য নয়। তিনি নিজের মত করে নতুন
কিছু জ্ঞানের নির্যাস দিতে পেরেছেন কিনা সেটাই বিবেচ্য। তাহলেই নতুন কিছু মাত্রা যোগ
হতে পারে। কিন্তু যদি বই ঘেটে, নেট ঘেটে যে নিয়ম কানুন সহজেই পাওয়া যায় তা দিয়ে বই
লিখলে বইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে নি:সন্দেহে। কিন্তু মাত্রা যোগ হবে কিনা সন্দেহ। অবশ্য
এ ধরনের বইয়েরও প্রয়োজন রয়েছে। আমি স্রেফ উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর জন্যই বললাম। কাউকে লক্ষ্য
করে বলিনি।
-
এবার একটু বীজগণিতে
আসি….
a এর সাথে a যোগ
করলে পাওয়া যায় 2a: a + a = 2a;
দুইটি a এর মাত্রা(power)
1 । এদেরকে যোগ করার ফলে পাওয়া গেল 2a । যোগফলের a এর মাত্রাও 1
। অর্থাৎ মাত্রা বৃদ্ধি পায়নি। শুধুমাত্র a এর সংখ্যা
বৃদ্ধি পেয়েছে। যেমনটা ঘটেছে AB রেখাকে C পর্যন্ত বর্ধিত করার পর।
এবার a এর সাথে
a গুণ করলে হয় a2 : a x a = a2
এবার কিন্তু
a এর মাত্রা 1 থেকে বেড়ে 2 হয়েছে। যেমনটা ঘটেছে AB রেখাকে তারকায় রূপান্তর করার পর।
-
আমি প্রবন্ধটিতে
দৃষ্টিকোণ বা দৃষ্টিভঙ্গি, মাত্রা এবং মাত্রা কিভাবে যোগ হয় ইত্যাদি বিষয় বাস্তবতার
আলোকে বিশ্লেষণ করে সবার বোধগম্য করার চেষ্টা করেছি মাত্র। পুরো বিষয়টাই আমার অনুর্বর
মস্তিষ্ক প্রসূত। ভুল ত্রুটি ক্ষমার উর্ধে্ব নয়।
--
বি:দ্র: আলোচ্য
পরিভাষাগুলোকে আমি যথাযথ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে শিখেছি S M Zakir Hussain প্রণীত ’উদ্ভাবনী
চিন্তার কাঠামো’ ও ‘অন্ধকারের বস্ত্রহরণ’ বই থেকে। রেখার উদাহরণটা খুব সম্ভবত দুইটা
বইয়ের যেকোন একটায় থাকতে পারে।
Comments
Post a Comment